মোকসেদুল ইসলাম
ড. মুহাম্মদ ইউনূস কেবল একজন ব্যক্তি নন, তিনি একটি বৈশ্বিক প্রতিষ্ঠান। ক্ষুদ্রঋণের ধারণা দিয়ে সারা বিশ্বের কোটি কোটি মানুষের ভাগ্য পরিবর্তনের কারিগর হিসেবে তিনি স্বীকৃত। আব্দুন নূর তুষার যখন তাকে “অসভ্য” বলে আখ্যায়িত করেন, তখন তিনি মূলত ড. ইউনূসকে নয়, বরং নোবেল কমিটির নিরপেক্ষতা এবং সারা বিশ্বের সেই সব রাষ্ট্রপ্রধান ও সংস্থাকে অপমান করেছেন যারা ড. ইউনূসকে সর্বোচ্চ সম্মানে ভূষিত করেছেন। একজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্বের কাছ থেকে এই ধরণের কুরুচিপূর্ণ এবং স্থুল আক্রমণ কোনোভাবেই কাম্য নয়। ব্যক্তিগত ঘৃণা বা রাজনৈতিক আদর্শের ভিন্নতা থাকতেই পারে, কিন্তু সেই ভিন্নতাকে যখন গালিগালাজ বা নিম্নরুচির শব্দে প্রকাশ করা হয়, তখন তা আর সমালোচনা থাকে না, বরং তা সস্তা প্রপাগান্ডায় রূপ নেয়। তুষার সাহেবের মতো একজন মানুষ, যিনি নিজেকে সুশীল সমাজের প্রতিনিধি হিসেবে দাবি করেন, তাঁর মুখ থেকে এমন ভাষা শোনার পর সাধারণ মানুষের কাছে তাঁর রুচিবোধ নিয়ে বড় ধরণের সংশয় তৈরি হয়েছে। কোনো প্রমাণ বা যুক্তি ছাড়াই ড. ইউনূসের মতো একজন মহীরুহকে নিয়ে এমন তুচ্ছতাচ্ছিল্য করা মূলত নিজের হীনমন্যতাকেই বিশ্ব দরবারে উন্মোচিত করার শামিল। এটি কেবল অসংলগ্ন মন্তব্য নয়, বরং এটি একজন নোবেল লরিয়েটের বিরুদ্ধে সুপরিকল্পিত চরিত্রের অবমাননা।
আব্দুন নূর তুষার দেশের বর্তমান মব সহিংসতার পরিস্থিতির জন্য সরাসরি প্রধান উপদেষ্টার ভূমিকা নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন, যা অত্যন্ত একপাক্ষিক এবং বিভ্রান্তিকর। একটি রাষ্ট্র যখন দীর্ঘদিনের অপশাসন ও কাঠামোগত ধ্বংসস্তূপের ওপর দাঁড়িয়ে পুনর্গঠিত হওয়ার চেষ্টা করে, তখন সেখানে আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতির চ্যালেঞ্জ আসাটা স্বাভাবিক। ড. ইউনূসের নেতৃত্বাধীন সরকার সবসময়ই পরিস্থিতি স্থিতিশীল করার আপ্রাণ চেষ্টা করছিল, অথচ তুষার সাহেব গঠনমূলক কথা না বলে বরং দায় চাপানোর রাজনীতিতে মেতে উঠেছেন। মব সহিংসতার পেছনে বিগত দিনের বিচারহীনতার সংস্কৃতি এবং ভেঙে পড়া প্রাতিষ্ঠানিক ব্যবস্থার দায় কতটুকু, সেদিকে ইঙ্গিত না করে সরাসরি প্রধান উপদেষ্টাকে অভিযুক্ত করা এক ধরণের এজেন্ডা বাস্তবায়নের প্রচেষ্টা বলেই মনে হয়। একজন বিশ্লেষক হিসেবে তাঁর উচিত ছিল সহিংসতার প্রকৃত কারণ ও তা নিরসনে জনসচেতনতা তৈরির কথা বলা, কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছেন বিদ্বেষের পথ। এই ধরণের মন্তব্য জনমনে বিভ্রান্তি ছড়ানোর পাশাপাশি বিশৃঙ্খলা সৃষ্টিকারীদের পরোক্ষভাবে উৎসাহ যোগাতে পারে। ড. ইউনূস যেখানে শান্তিবাদী আদর্শের জন্য বিশ্বজুড়ে পরিচিত, সেখানে তাঁর ওপর সহিংসতার দায় চাপানো কেবল হাস্যকরই নয়, বরং চরম বস্তুনিষ্ঠতাহীনতার বহিঃপ্রকাশ। এটি সাংবাদিকতার নৈতিকতার সাথেও সরাসরি সাংঘর্ষিক এবং সাধারণ মানুষের বুদ্ধিমত্তাকে উপহাস করার শামিল।
সোশ্যাল মিডিয়ায় সাধারণ মানুষের একটি বড় প্রশ্ন হলো ড. ইউনূসের যোগ্যতাকে প্রশ্ন করার মতো যোগ্যতা আব্দুন নূর তুষার নিজে অর্জন করেছেন কি না? ড. ইউনূস গ্রামীণ ব্যাংক এবং সামাজিক ব্যবসার মাধ্যমে বাংলাদেশের নাম উজ্জ্বল করেছেন, ইউএস প্রেসিডেন্সিয়াল মেডেল অফ ফ্রিডম থেকে শুরু করে অলিম্পিক লরেল পর্যন্ত অসংখ্য সম্মাননা দেশের ঝুড়িতে এনেছেন। অন্যদিকে, আব্দুন নূর তুষার একজন গণমাধ্যম ব্যক্তিত্ব হিসেবে পরিচিত হলেও দেশের উন্নয়নে বা জনকল্যাণে তাঁর দৃশ্যমান অবদান অতি সামান্য। সমালোচনা করার অধিকার সবার আছে, কিন্তু সেই সমালোচনা যখন ড. ইউনূসের মতো বিশ্বস্বীকৃত ব্যক্তিত্বের বিরুদ্ধে যায়, তখন সমালোচকের নিজের ট্র্যাক রেকর্ড সামনে আসাটাই স্বাভাবিক। সা ড. ইউনূস যখন সরকারে এসে সংস্কারের কঠিন দায়িত্ব নিয়েছেন, তখন নিরাপদ দূরত্বে বসে টিপ্পনী কাটা এবং তাকে অপমান করা কেবল ভণ্ডামি ছাড়া আর কিছু নয়। তুষার সাহেবের এই আক্রমণকে অনেকে “চাটুকারিতা” হিসেবেও দেখছেন, কারণ রাজনৈতিক পটপরিবর্তনের এই সময়ে বিতর্কিত মন্তব্য করে বিশেষ কোনো মহলের দৃষ্টি আকর্ষণ করা তাঁর পুরনো কৌশল হতে পারে। ড. ইউনূসের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা যেখানে প্রশ্নাতীত, সেখানে তাঁর যোগ্যতাকে খাটো করার চেষ্টা কেবল সমালোচকের নিজের ক্ষুদ্রতাকেই বড় করে দেখায়।
একজন সাংবাদিক বা মিডিয়া ব্যক্তিত্ব সমাজের দর্পণ হিসেবে কাজ করেন, কিন্তু আব্দুন নূর তুষারের সাম্প্রতিক ভাষা এবং উপস্থাপনা সেই দর্পণকে কলঙ্কিত করেছে। গঠনমূলক সমালোচনা এবং ব্যক্তিগত বিদ্বেষের মধ্যে একটি সূক্ষ্ম রেখা থাকে, যা তিনি সজ্ঞানে অতিক্রম করেছেন। একজন নোবেল বিজয়ীর বিরুদ্ধে “অসভ্য” বা “মিশন নিয়ে নামা”র মতো অভিযোগগুলো কোনো সুস্থ ধারার সাংবাদিকতার অংশ হতে পারে না। তথাকথিত এই সমালোচনা কেবল ব্যক্তিগত ঈর্ষা বা কোনো নির্দিষ্ট গোষ্ঠীর এজেন্ডা বাস্তবায়নের হাতিয়ার বলে প্রতীয়মান হচ্ছে। নেটিজেনদের মতে, তুষার সাহেব যদি ড. ইউনূসের নীতির সমালোচনা করতেন, তবে তা গ্রহণীয় হতো; কিন্তু তিনি বেছে নিয়েছেন চরিত্রহননের পথ। এটি কেবল সাংবাদিকতার আদর্শের পরিপন্থী নয়, বরং এটি শিক্ষিত সমাজের জন্য একটি উদ্বেগের বিষয়। যখন একজন প্রভাবশালী ব্যক্তি এমন বিষোদগার ছড়ান, তখন তা তরুণ প্রজন্মের কাছে ভুল বার্তা পৌঁছায় এবং সুস্থ বিতর্কের পরিবেশ নষ্ট করে। ড. ইউনূসের কর্মকাণ্ড ও দর্শন বিশ্বজুড়ে পাঠ্যপুস্তকের বিষয়, তাঁর অবদান গবেষণার বিষয়। সেই বিশালতাকে অস্বীকার করে সংকীর্ণ গণ্ডিতে তাকে সমালোচনা করা প্রমাণ করে যে, তুষার সাহেব বৈশ্বিক বাস্তবতা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে কেবল সংকীর্ণ রাজনৈতিক স্বার্থের গোলকধাঁধায় আটকে আছেন। তাঁর এই অবস্থান আজ তাকে গণমানুষের কাঠগড়ায় দাঁড় করিয়েছে।